রাতের রাণী হাস্নাহেনা
অঙ্গসৌষ্ঠবে উল্লেখ করার মতো কোন সৌন্দর্য নেই, শরীর এতোই দুর্বল যে নিজের দাড়িয়ে থাকার মতো শক্তিও নেই, লিকলিকে গড়নের কারনে প্রায়ই মাটির সাথে লুটোপুটি খায়। তারপরও ‘প্রথমে দর্শনধারী পরে গুণবিচারি’ বাংলার এই সনাতন প্রবাদ প্রবচনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের সুগন্ধ দিয়ে মাতোয়ারা করে রেখেছে বিশ্বব্রমান্ডের পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণের সকল মানুষকে।
বলছিলাম হাস্নাহেনার কথা। আদি নিবাস ওয়েষ্ট ইন্ডিজে হলেও বিশ্বের সকল প্রান্তের মানুষের কাছে সৌরভের কারনে জনপ্রিয়। ধারণা করা হয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে কলম্বাসের মাধ্যমে এটি ইউরোপ, উত্তর আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। solanaceae পরিবারের এ উদ্ভিদটিকে গুণের কারনে বিশ্বের বিভিন্নপ্রান্তে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। কেউ ডাকে Night blooming jasmine, Lady of the Night, Night queen. আমরা আদর করে ডাকি ‘রাতের রাণী, উর্দু ও হিন্দিতে বলা হয় ‘রাত কি রাণী’। এর বৈজ্ঞানিক নাম cestrum nocturnum. এটি আমাদের দেশে এতো জনপ্রিয় যে মনেই হয় না এর উৎপত্তিস্থল ভিনদেশে।
হাস্নাহেনা ক্রমবর্ধনশীল চিরহরিৎ উদ্ভিদ। এটি চার মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতা সরু, সরল, বল্লমাকার, মসৃণ ও চকচকে হয়ে থাকে। ফুল ছোট সরু, নলাকার। ফুলের তেমন কোন সৌন্দর্য নেই, এর যতো সৌন্দর্য এর গন্ধে। ছোট ছোট অসংখ্য ফুল রাতের বেলা চারদিক সস্মোহিত করে রাখে। রাতে ফুল থেকে কড়া, শক্তিশালী, মিষ্টি সুবাস বের হয়। প্রায় সারা বছর দফায় দফায় ফুল ফুটে। বর্ষাকালে ফুলের প্রাচুর্য দেখা যায়।
হাস্নাহেনার বংশবিস্তার খুবই সহজ। একটি ডাল কেটে পানির বোতলে রেখে দিলে তিনচার সপ্তাহে শিকড় গজিয়ে যায়। এরপর তা বাগানে বা টবে স্থানান্তর করলে সেবছরেই ফুল ফোঁটে। এছাড়া কান্ড কেটে সরাসরি মাটিতে লাগিয়ে দিলেও এ গাছ হয়ে যায়। দাবা কলম কিংবা গুটিকলম করেও এর চারা উৎপাদন করা যায়।
দ্রুতবর্ধনকালীন এবং ফুল ফোটার সময়ে গাছে প্রচুর খাদের প্রয়োজন হয়। তখন শুধু গোবর বা জৈব সার মাটিতে এদের চাহিদা পূরণ হয় না। টবে চাষ করলে এসময় রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয়। যে মিশ্রসারে ফসফরাসের পরিমান বেশি আছে সেটি পনের দিন পরপর প্রয়োগ করা দরকার। উত্তর আমেরিকায় শীতের সময় এটিকে গ্রীণহাউজ বা ঘরে জানালার কোনায় স্থান করে দিতে হবে, যেখানে রোদ আসে। ঘরে থাকাকালীন যদি দেখা যায় পাতা কুকড়ে গেছে তাহলে বুঝতে হবে এর খাদ্যের অভাব হয়েছে।
উত্তরার সরকারি কোয়ার্টারে যখন থাকি তখন শত অসুবিধার কথা চিন্তা করেও চারতলা ভবনের নীচতলা বেছে নিয়েছিলাম সামনে পিছনের কিছুটা খোলা জায়গা ছিলো বলে। শীতের শুরুতে সামনের একফালি জায়গায় মনের মাধুরী মিশিয়ে বাগান করি। এ কাজ করার সময় আমার বড় ছেলে একদিন বলেছিলো ” আব্বু গন্ধে সাপ আসে এমন কোন ফুলের গাছ নেই”। আমরা অফিসে থাকি, ছেলে বুয়ার সাথে টিভিতে সিনেমা দেখে, বুঝলাম ছেলের মাঝে এ উপলব্ধি সিনেমা দেখার ফল। ছেলে বলেছে তাই নার্সারি থেকে সেবারই নিয়ে এসে লাগিয়েছিলাম হাস্নাহেনা। পরের বছরেই হাস্নাহেনা ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করতো পুরো বাড়ী । প্রতিদিন আমার ছেলে তার ঘরের জানালা দিয়ে সাপের উপস্থিতি লক্ষ্য করে, তার সাথী হয় বুয়া। এতো গন্ধেও যখন সাপ আসলো না, তখন সে বুঝতে পারে ফুলের গন্ধে সাপ আসার বিষয়টি আসলে কল্পনা।
ফুলের গন্ধে সাপ আসার ঘটনাকে বিষয় করে বাংলা সাহিত্য আর চলচিত্র আজগুবি সব গল্প তৈরি করেছে। ফুলের গন্ধে সাপ আসে এর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আমরা জানি সাপের ঘ্রাণশক্তি খুবই কম। তবে ফুলের গন্ধে সাপ যদি এসেও থাকে এবং এটি কেউ দেখেও থাকে তবে সে ঘটনাটিকে আমরা অন্যভাবে বিশ্লেষণ করতে পারি। হাস্নাহেনা ফুল তার গন্ধ দিয়ে প্রচুর কীটপতঙ্গ আকর্ষন করে। এই কীটপতঙ্গ খেতে আসে ব্যাঙ। ব্যাঙকে খেতে আসে সাপ। এটিকে বলা হয় Eco-system বা বাংলায় বাস্তুতন্ত্র।
এই পরবাসেও উত্তরা পোস্টাল কোয়ার্টারের হাস্নাহেনাকে ভুলতে পারি নি। বছর পাঁচেক আগে বেশ দাম দিয়েই কিনে এনেছিলাম একটি হাস্নাহেনার গাছ। প্রতিবছর সে গাছ থেকে অজস্র চারা করি। মুল গাছটি রেখে দেই ডেকে, শীতের শুরুতে তা নিঁযে আসি অন্দরে। আমরা প্রতিদিনই ডেকে বসে উপভোগ করি এর মনোহর সুবাস। দাওয়াতে এসে অতিথিরা এর গন্ধে সম্মোহিত হয়ে পরেন।
হাসনাহেনা ফুল সম্পর্কে কৃষিবিদ মমিনুল আযমের তথ্যবহুল ও সৃতিকাতর আর্টিকেল.

04
Feb